শিক্ষা খাতে দুর্নীতি - বই যাচাইয়ে কোটি টাকার ঘুষ লেনদেন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ জুলাই, ২০২৫ এ ৩:৪৬ এএম
৭৭ হাজার টাকার কাজের পেছনে কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারি : ছবি সংগৃহীত

৭৭ হাজার টাকার কাজের পেছনে কোটি টাকার ঘুষ কেলেঙ্কারি : ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া কোটি কোটি বইয়ের মান তদারকির কাজ এখন এক দুর্নীতির চোরাবালিতে পরিণত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা, ঘুষ-দুর্নীতি এবং সিন্ডিকেট প্রভাবে বইয়ের মান যাচাইয়ের জন্য নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্সিগুলো কাজ পাচ্ছে অস্বাভাবিক কম মূল্যে। ৭৭ হাজার টাকার কাজ পেতে কেউ কেউ ঘুষ দিয়েছেন কোটি টাকা পর্যন্ত। অথচ এই কাজের প্রকৃত মূল্য লাখ লাখ টাকা, এমনকি কোটি টাকারও বেশি।

দরপত্র প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম, অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে কাজ প্রদান, পছন্দের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সরকারি অর্থের অপচয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।

 

ঘুষের বিনিময়ে কাজ পাওয়ার মহাযজ্ঞ

২০২৩ সালে এনসিটিবির পিএলআই (পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন) এজেন্ট নিয়োগে এমন একটি প্রতিষ্ঠান কাজ পায় যারা ৭৭ হাজার টাকা দর দিয়েছিল। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এনসিটিবির তৎকালীন সচিব নাজমা আক্তারকে ঘুষ হিসেবে দেয়া হয় ১ কোটি টাকা। অভিযোগ অনুযায়ী, ছাত্রলীগপন্থী হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। বরং তিনি আরও প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাজ পেতে উৎসাহিত করেছেন বলে জানা যায়।

এই এজেন্টের কাজ ছিল ছাপানো বইগুলোর মান যাচাই করা, উপজেলা পর্যায় থেকে দৈবচয়নের মাধ্যমে বই সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো, এবং সেই প্রতিবেদন জমা দেওয়া। এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ মাত্র ৭৭ হাজার টাকায় হওয়া কেবল অস্বাভাবিক নয়, ভয়ঙ্কর প্রতারণাও।

 

দরপত্রের অস্বাভাবিক চিত্র ও অনিয়ম

২০২৪ সালের মাধ্যমিক পর্যায়ের বইয়ের মান যাচাইয়ের কাজে সর্বোচ্চ দর ছিল ৩২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সর্বনিম্ন দর ছিল মাত্র ৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। কিন্তু পিপিআর (Public Procurement Rules) অনুযায়ী, সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও এনসিটিবি সেই নিয়ম ভেঙে ষষ্ঠ সর্বোচ্চ দরদাতাকে কাজ দেয়। এতে সরকারের বাড়তি ২৯ লাখ টাকা খরচ হয়। এনসিটিবি পরে যুক্তি দেয়, এটি একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং ভালো মানের সেবা দিতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিষ্ঠানই নিম্নমানের কাগজে ছাপানো বইকে ‘ভালো’ বলে ছাড়পত্র দেয়।

একই অনিয়ম দেখা যায় পিএলআই কাজেও। ছয়টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটিকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরে কাজ দেওয়া হয়, যাদের কার্যক্রম নিয়ে পরবর্তীতে প্রশ্ন ওঠে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তারা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে—বইয়ের মান যাচাইয়ের নামে প্রহসন চলছে।

 

ব্যয় ৭২ লাখ, কাজের চুক্তি ২৯ লাখে!

২০১৬ সালে প্রাথমিক স্তরের বই যাচাইয়ের কাজের জন্য চুক্তি হয়েছিল ৩.৫ কোটি টাকায়। কিন্তু ২০২৪ সালে একই ধরনের কাজের চুক্তি হয় মাত্র ২৯ লাখ টাকায়। অথচ এনসিটিবির নিজস্ব হিসাবেই দেখা গেছে, এই কাজ করতে বাস্তবে খরচ হয় ৭২ থেকে ৭৫ লাখ টাকা।

এই কাজে অন্তর্ভুক্ত আছে:

বিএসটিআই পরীক্ষার খরচ (২৬ লাখ টাকা)

প্রতিটি উপজেলায় বই সংগ্রহের খরচ (৫ লাখ টাকা)

শতাধিক প্রেসে ২৪ ঘণ্টার জন্য তদারক কর্মকর্তা নিয়োগ (৪০ জনের বেতন বাবদ ৪০ লাখ টাকা)

ল্যাব খরচ, অফিস ব্যয়, ট্যাক্সসহ অন্যান্য খরচ

এই হিসাব অনুসারে, ২৯ লাখ টাকায় মানসম্পন্ন কাজ করা অসম্ভব। ফলে, বইয়ের মান যাচাই না করে রিপোর্ট তৈরি করা এবং ঘুষের মাধ্যমে বিল ছাড় করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও মিথ্যে নয়।

 

সিন্ডিকেট ও স্বার্থচক্রের দাপট

৩০ কোটির বেশি বই তদারকির বিশাল দায়িত্ব এখন হাতে গোনা ৮-১০টি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এদের মধ্যে রয়েছে: ব্যুরো ভ্যারিটাস, ইনফিনিটি সার্ভে, ইউনাইটেড সার্টিফিকেট সার্ভিসেস, ফনিক্স, কন্ট্রোল ইউনিয়ন, শেখ ট্রেডিং অ্যান্ড ইন্সপেকশন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইন্সপেকশন ইত্যাদি। এসব প্রতিষ্ঠানের পিছনে বড় বড় ছাপাখানার মালিকদের বিনিয়োগ রয়েছে। কাজ পাওয়ার পরেই তারা অন্যান্য ছাপাখানা মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা করে নিম্নমানের বইকে ‘ভালো’ বলে ছাড়পত্র দেয়।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান ব্যুরো ভ্যারিটাস এক সময় কোটি টাকায় দর দিলেও বর্তমানে তারাই ৩২ লাখ টাকায় কাজ করছে—প্রমাণ করছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা।

 

পদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এনসিটিবির বিতরণ নিয়ন্ত্রক হাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের দরপত্রে তিনি সরকারি-বেসরকারি অভিজ্ঞতার শর্তের স্থলে শুধু সরকারি অভিজ্ঞতার শর্ত রেখে নিজেই কিছু প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন এজেন্ট নিয়োগে তিনি যুক্ত ছিলেন না।

 

নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য পরিবর্তন

এনসিটিবির বর্তমান চেয়ারম্যান (চলতি দায়িত্বে) অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, “পরিদর্শনের কাজে কী এমন মধু, তা আমিও বুঝি না। কিন্তু অনেকে এসে বলে তারা বিনা টাকায় কাজ করতে চান। মানে কিছু একটা অবশ্যই আছে। এবার আমরা কড়া শর্ত ও তদারকির মধ্যে এনে নতুন নীতিমালা তৈরি করব। পিএলআই পদ্ধতিও বাতিলের চিন্তা করছি।”

 

উপসংহার:

বইয়ের মান যাচাইয়ের নামে এই দুর্নীতি শুধু শিক্ষাখাত নয়, পুরো জাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে নিম্নমানের বই তুলে দেওয়া মানে জাতির ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতারণা। এই দুর্নীতির চক্র ভেঙে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর পরিদর্শন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা না করলে ভবিষ্যতে শিক্ষাখাত আরও বড় সংকটে পড়বে।


আজকের প্রথা/মেহেদি-হাসান