রহস্যময় পুরুষ হযরত খিজির (আ.) এবং তাকে বিক্রির কাহিনী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ আগস্ট, ২০২৫ এ ১১:১২ এএম
ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

যদি কেউ খোদাবন্দের নামের দোহাই দিয়ে কিছু প্রার্থনা করে আর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ তাকে ফিরিয়ে দেয়, তবে কিয়ামতের দিন সে এমনভাবে দাঁড়াবে—তার মুখে থাকবে না মাংস, না চামড়া; শুধু হাড়ের খটখট শব্দ শোনা যাবে।
আমি আমার পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে নিরাশ করি না।

একদিন রহস্যময় পুরুষ খিজির বনি ইসরায়েলের এক ব্যস্ত বাজারে হাঁটছিলেন। মানুষের ভিড়, ক্রয়-বিক্রয়ের শব্দের মাঝেই এক মুকাতাব দাস তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়াল। ভিক্ষুকসুলভ কণ্ঠে বলল—“হে পরদেশি, আমাকে কিছু সদকা দিন, খোদাবন্দ আপনাকে বরকত দান করবেন।”খিজির শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বললেন—“আমি আমার পালনকর্তার উপর ভরসা করেছি। যা তিনি চান তাই ঘটবে। কিন্তু আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।”

লোকটি হাল ছাড়ল না। আবার অনুরোধ করল—“আমি খোদাবন্দের ওয়াস্তে চাইছি, হুজুর। আপনার মুখে দানশীলতার আভা দেখি, তাই আপনাকে বরকত কামনা করছি।”
খিজির আবারও আগের উত্তর দিলেন—“আমি আমার পালনকর্তার উপর ভরসা করছি, যা তিনি চান তাই ঘটবে। কিন্তু আমার কাছে তোমাকে দেওয়ার মতো কিছুই নেই।” কিছুক্ষণ থেমে তিনি শান্ত স্বরে বললেন—“তবে চাইলে তুমি আমাকে বিক্রি করতে পারো।”

মিসকিন বিস্মিত হয়ে বলল—“আপনাকে বিক্রি করলে কিছু হবে?”
খিজির বললেন—“হ্যাঁ, তুমি খোদাবন্দের নামের দোহাই দিয়ে আমাকে প্রার্থনা করেছ। আমার পালনকর্তার সন্তুষ্টির জন্য আমি তোমাকে নিরাশ করব না। যাও, আমাকে বিক্রি কর।”

লোকটি তাকে বাজারে নিয়ে গেল এবং চারশ দিরহামে এক ক্রেতার কাছে বিক্রি করল। খিজির চুপচাপ নতুন প্রভুর ঘরে অবস্থান করতে লাগলেন। দিন গড়াল, কিন্তু মালিক কোনো কাজ দিল না। একদিন খিজির নিজেই বললেন—“আপনি তো আমাকে কোনো কাজে ব্যবহার করছেন না, অথচ উপকারের আশাতেই তো ক্রয় করেছেন।”

মালিক মৃদু হেসে বলল—“আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না। আপনি তো বয়স্ক ও দুর্বল।”
খিজির উত্তর দিলেন—“তা হবে না। কর্মহীনতাই আমার জন্য কষ্টকর। কাজ দিন।”
তখন মালিক বলল—“যদি তাই হয়, তবে এ পাথরের স্তূপ সরিয়ে দাও। জেনে রেখো, ছয়জন মানুষ মিলে একদিনেও এগুলো সরাতে পারে না।”

মালিক ফিরে এসে দেখল—সব পাথর উধাও! খিজির মুহূর্তেই সেগুলো সরিয়ে ফেলেছেন।
এরপর একদিন মালিক সফরে যাওয়ার আগে খিজিরকে বললেন—“আমি আপনাকে আমানতদার মনে করি। আমার অনুপস্থিতিতে পরিবারের দায়িত্ব নিন।”

খিজির বললেন—“ঠিক আছে। তবে কিছু কাজ দিয়ে যান।”
লোকটি হেসে বলল—“আমি আপনাকে কষ্ট দিতে চাই না।”
তিনি জবাব দিলেন—“আমার কাছে কোনো কাজই কষ্টকর নয়।”
মালিক তখন বলল—“তাহলে আমি ফিরে আসা পর্যন্ত ঘরের জন্য ইট তৈরি করতে থাকুন।”

সফর শেষে ফিরে এসে মালিক হতবাক হয়ে গেল। শুধু ইট নয়—একটি প্রাসাদ তৈরি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার আঙিনায়! বিস্ময়ে সে জিজ্ঞেস করল—“খোদাবন্দের দোহাই দিয়ে বলুন, আপনি কে?”
খিজির উত্তর দিলেন—“তুমি খোদাবন্দের নামের দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করেছ, তাই বলছি—আমি খিজির। এক মিসকিন আমার কাছে সদকা চাইছিল, কিন্তু আমার কাছে কিছু ছিল না। আবারও সে খোদাবন্দের ওয়াস্তে চাইলো। আমি তাকে নিরাশ করিনি, বরং নিজেকেই তার হাতে সমর্পণ করেছি। সে আমাকে বিক্রি করেছে। মনে রেখো—যদি কেউ খোদাবন্দের দোহাই দিয়ে কিছু প্রার্থনা করে আর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে কিয়ামতের দিন সে এমন অবস্থায় দাঁড়াবে তার মুখে থাকবে না মাংস, না চামড়া; শুধু হাড়ের খটখট শব্দ শোনা যাবে।”

মালিক কেঁপে উঠল। বলল—“আমি খোদাবন্দের উপর ঈমান আনলাম। হে খিজির, অজান্তেই আপনাকে কষ্ট দিয়েছি।”
খিজির তাকে সান্ত্বনা দিলেন—“না, তুমি সদাচরণ করেছ। আমার উপর আস্থা রেখেছ। এতে আমার কোনো কষ্ট হয়নি।”


লোকটি বলল—“হে খিজির, আমার পরিবার-সম্পদ সবই আপনার জন্য হাজির। আপনি যেমন চান তেমন সিদ্ধান্ত নিন। কিংবা চাইলে এখনই মুক্তি পান।”
খিজির ধীর স্বরে বললেন—“আমি চাই তুমি আমাকে মুক্ত করো, যেন আমি আমার পালনকর্তার ইবাদতে মনোযোগ দিই।”

লোকটি তখনই তাঁকে মুক্ত করে দিল। খিজির আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন—“সব প্রশংসা সেই খোদাবন্দের, যিনি আমাকে দাসত্বে নিপতিত করেছিলেন, আবার তাঁরই ইচ্ছায় মুক্তও করেছেন।”