কবি আল মাহমুদের ৮৯তম জন্মদিন

হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে যেসব বাংলা কবিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ জুলাই, ২০২৫ এ ৪:৪৭ এএম
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ । ছবি : সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ । ছবি : সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের আজ ৮৯তম জন্মদিন। ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি কবি। ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তবে তার সাহিত্যকর্ম তাকে অমরত্ব দিয়েছে।

একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকার, শিশুসাহিত্যিক এবং সাংবাদিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আল মাহমুদ।

কবিতার এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর

আল মাহমুদ বাংলা কবিতায় আবির্ভূত হয়েছিলেন এক নতুন কণ্ঠস্বর নিয়ে। তার কবিতায় উঠে এসেছে মাটি ও মানুষের কথা, গ্রামীণ জীবনের ছবি ও লোকজ সংস্কৃতির ছাপ। শহুরে টানাপোড়েন, প্রেম, আত্মসংঘাত ও বাস্তবতাও ফুটে উঠেছে তার লেখায়। কবি রফিক আজাদ তাকে একবার আখ্যায়িত করেছিলেন— “গ্রাম থেকে শহরে আসা এক আত্মপ্রত্যয়ী কবি” হিসেবে।

তার পুরো নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ হলেও সাহিত্যজগতে ‘আল মাহমুদ’ নামেই পরিচিত। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ সালে। আর ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’— যা বাংলা কবিতায় এক নতুন বাঁক তৈরি করে।

আধুনিক বাংলা কবিতার মাইলফলক

‘লোক লোকান্তর’-এর পর ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’, ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ তাকে নিয়ে যায় অনন্য উচ্চতায়। এর মধ্যে ‘সোনালী কাবিন’ আধুনিক বাংলা কবিতার এক মাইলফলক। এই গ্রন্থে ব্যবহৃত সনেট, লোকজ শব্দভাণ্ডার এবং প্রেমের ব্যঞ্জনা বাংলা কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

সাংবাদিকতায় অবদান

শুধু কবিতা নয়, সাংবাদিক হিসেবেও আল মাহমুদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৫৪ সালে লেখালেখির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেন তিনি। এরপর কাজ করেন সাপ্তাহিক কাব্য, দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক ইত্তেফাক, কর্ণফুলী ও গণকণ্ঠে। দৈনিক গণকণ্ঠের সম্পাদক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি শিল্পকলা একাডেমিতে যোগ দেন এবং পরিচালক হিসেবে ১৯৯৭ সালে অবসর নেন।

কথাসাহিত্যে সফল পদচারণা

কবিতা ছাড়াও তার উপন্যাস ও ছোটগল্প বাংলা সাহিত্যে বিশেষ স্থান দখল করেছে। ‘কবির মৃত্যু’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উপমাহীন উপকূল’, ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ উপন্যাসগুলোতে গ্রামীণ বাস্তবতা, দারিদ্র্য ও আত্মিক টানাপড়েন তুলে ধরা হয়েছে গভীর আবেগে। তার ছোটগল্প ‘লোকটি’, ‘মায়া’, ‘তোমার চোখে আলো দেখে’ পাঠকের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলে।

ধর্মীয় চেতনা ও বিতর্ক

আল মাহমুদের সাহিত্যজীবনের শেষ পর্যায়ে ধর্মীয় অনুভব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামি ভাবধারা, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে সাহিত্যে তুলে ধরার কারণে পাঠকসমাজে মতভেদ তৈরি হলেও সাহসী প্রকাশভঙ্গি তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করেছে। কেউ কেউ তাকে রক্ষণশীল বললেও, তার ভাষা ও উপমা বরাবরই ছিল সাহিত্যের প্রয়োজনেই দৃপ্ত।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি

তার সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি পেয়েছেন বহু সম্মাননা। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮)

  • একুশে পদক (১৯৮৭)

  • ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার

  • নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার

  • ত্রিকাল সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা)

আল মাহমুদ শুধু একজন কবিই ছিলেন না, ছিলেন সময়ের দ্রষ্টা, জাতিসত্তার কণ্ঠস্বর এবং সাহিত্যের এক অনবদ্য নির্মাতা। তার সাহিত্য আজও পাঠক-মানসে জীবন্ত, নবীন কবিদের অনুপ্রেরণার উৎস।

 

আজকের প্রথা/ইতি