ইরানে বিক্ষোভে নিহতদের তালিকা প্রকাশ, তথ্যের অভাবে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক ডেষ্ক
আন্তর্জাতিক ডেষ্ক
৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ৬:৪৫ এএম
ইরানে বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, নিহতদের তালিকা প্রকাশ ঘিরে নতুন বিতর্ক। ছবি সংগৃহীত

ইরানে বিক্ষোভ চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি, নিহতদের তালিকা প্রকাশ ঘিরে নতুন বিতর্ক। ছবি সংগৃহীত

সাম্প্রতিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিহতদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ইরান সরকার, যা দেশজুড়ে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রায় তিন হাজার নিহতের নাম প্রকাশ করা হলেও তালিকায় মৃত্যুর সময়, স্থান, কারণ কিংবা ঘটনার বিস্তারিত তথ্য না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সরকার সম্প্রতি অনলাইনে একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে ২ হাজার ৯৮৬ জন নিহতের পূর্ণ নাম, তাঁদের পিতার প্রথম নাম এবং জাতীয় পরিচয় নম্বরের শেষ ছয়টি সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে আরও ১৩১ জন নিহত এখনো শনাক্ত করা যায়নি বলে তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় একই নাম একাধিকবার থাকা এবং অনেক নাম বাদ পড়ার অভিযোগও উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকার একটি আলাদা ওয়েবসাইট চালু করেছে, যেখানে নাগরিকরা তালিকায় অনুপস্থিত নাম রিপোর্ট করতে পারবেন। তবে তালিকাটি কবে হালনাগাদ করা হবে বা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে—সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি কর্তৃপক্ষ।

ইরান সরকার দাবি করেছে, নিহত সবাই দেশের সন্তান এবং কোনো পরিবারকে উপেক্ষা করা হবে না। তবে একই সময়ে রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করায় সরকারের অবস্থান নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এই ভাষ্য নিহতদের প্রকৃত পরিচয় ও ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল।

এদিকে জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিক্ষোভে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি হতে পারে। যদিও ইরান সরকার এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে একে “ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে মন্তব্য করেছে।

বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছে ইরানের বিনোদন জগতেও। জনপ্রিয় অভিনেত্রী এলনাজ শাকারদোস্ট এক লিখিত বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তিনি আর ইরানি সিনেমায় অভিনয় করবেন না এবং ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বর্জন করবেন। তিনি বলেন, “আমি আর কখনো এমন ভূমিতে কোনো চরিত্রে অভিনয় করব না, যা রক্তের গন্ধে ভরা।”

সাংবাদিকরাও সরকারের জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। হাম-মিহান পত্রিকার সাংবাদিক প্যারিসা হাসেমি বলেন, দেশটি দুর্নীতি, দারিদ্র্য, জ্বালানি ও জল সংকট এবং দূষণের মতো গুরুতর সমস্যায় জর্জরিত হলেও কেউ দায় স্বীকার বা পদত্যাগ করেনি। তবে সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এসব প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে শুধু “আশা ধরে রাখার” আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

এদিকে সমালোচনার বিষয়বস্তুতে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে। ইরানের সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনা তাদের প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের সমালোচনামূলক অংশ সম্পাদনা বা বাদ দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সব মিলিয়ে, নিহতদের তালিকা প্রকাশ ইরানে স্বচ্ছতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তথ্যের ঘাটতি, ভিন্নমুখী দাবি এবং কঠোর সরকারি অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।