এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আইসিসি-বির গোলটেবিলে তর্ক-বিতর্ক

অর্থনীতি ডেস্ক
অর্থনীতি ডেস্ক
২৮ জানুয়ারী, ২০২৬ এ ৪:০২ এএম
আইসিসি-বি আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ব্যবসায়ী নেতারা।

আইসিসি-বি আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এলডিসি উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও ব্যবসায়ী নেতারা।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ প্রশ্নে বাংলাদেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়—এমন আশঙ্কা তুলে ধরেছেন দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতারা। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, এলডিসি উত্তরণ শুধু শুল্ক বা বাণিজ্য সুবিধার হিসাব নয়; এটি একটি বড় অর্থনৈতিক রূপান্তরের অনিবার্য প্রক্রিয়া। মঙ্গলবার (তারিখ) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-বাংলাদেশ (আইসিসি-বি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এই পাল্টাপাল্টি মত উঠে আসে।

রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংক খাতে এলডিসি উত্তরণের প্রভাব: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আইসিসি-বি সভাপতি মাহবুবুর রহমান। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবিব।

আলোচনায় ব্যবসায়ী নেতারা এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, “আমরা এলডিসি উত্তরণ চাই, কিন্তু বাস্তবতা হলো—এখনো আমরা প্রস্তুত নই। গত আট বছরে কেবল সভা-সেমিনার হয়েছে, কার্যকর প্রস্তুতি হয়নি। সামনে সময়টা কাজে লাগাতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।”

রপ্তানিমুখী খাতের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ জানান, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব নিয়ে বিদেশি ক্রেতারা ইতোমধ্যে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন। তিনি বলেন, “দুই বিলিয়ন ডলার আমদানি করা এক ক্রেতা অর্ডার স্থানান্তরের ইঙ্গিত দিয়েছেন।” ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি রিজওয়ান রহমানের মতে, বাংলাদেশ এখনো এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রস্তুত নয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেড় বছরে অর্থনীতিতে কী পরিবর্তন হয়েছে যে আগে বিরোধিতাকারী অর্থনীতিবিদরা এখন উত্তরণের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি একে আজাদ বলেন, এলডিসি উত্তরণের প্রভাব বর্তমান সরকারকে যথাযথভাবে বোঝানো যায়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেই এসব ঝুঁকির বিষয় তুলে ধরতে হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু মুদ্রানীতি কঠোর করলেই মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব নয়। তার দাবি, কঠোর মুদ্রানীতির কারণে ইতোমধ্যে প্রায় ১২ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং আগামী ছয় মাসে আরও ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো ছাড়া অর্থনীতি টেকসই করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের জবাবে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এলডিসি থেকে উত্তরণ আজ হোক বা কাল—হতেই হবে। এটি শুধু শুল্ক সুবিধার বিষয় নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রূপান্তর।” তিনি বলেন, এই রূপান্তরের জন্য উন্নত লজিস্টিকস, আধুনিক বন্দর, শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা, আইসিটি উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ জরুরি। গভর্নরের ভাষায়, “বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা সোমালিয়া বা সুদানের মতো পিছিয়ে থাকব, নাকি ভারত-সিঙ্গাপুরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়াব।”

গভর্নর বাণিজ্য সংগঠনগুলোর ভূমিকাও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ব্যাংক ঋণের সুদের হার কৃত্রিমভাবে নির্ধারণের সময় অনেক সংগঠন চাপ সৃষ্টি করেছে, যা পরে আর্থিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের প্রসঙ্গে তিনি জানান, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ অর্থ মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। এগুলো দ্রুত পাস না হলে বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও শক্তিশালী করা কঠিন হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আইসিসি-বির গোলটেবিল বৈঠক স্পষ্ট করেছে, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে এখনো বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। একদিকে প্রস্তুতির ঘাটতির আশঙ্কা, অন্যদিকে অনিবার্য রূপান্তরের যুক্তি—এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই বাংলাদেশের সামনে রয়েছে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা। আগামী দিনে নীতি, দক্ষতা ও কাঠামোগত সংস্কার কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাংলাদেশের পথচলা।