এআই দিয়ে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা শনাক্তে নতুন উদ্যোগ ভারতের, বিতর্ক তুঙ্গে


এআই ব্যবহার করে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা শনাক্তের উদ্যোগ নিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার। প্রযুক্তির নির্ভুলতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ছবি: সংগৃহীত
ভারতে নাগরিকত্ব শনাক্ত ও অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে মহারাষ্ট্র প্রশাসন। রাজ্যটিতে বেআইনিভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মুম্বাই প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (আইআইটি) মুম্বাই। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক ও প্রযুক্তি মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কয়েক মাস ধরে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় নাগরিকত্ব যাচাই করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে অবৈধ অভিবাসী সন্দেহে অনেককে আটক করে সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে পাঠানোর অভিযোগও উঠেছে। কোথাও কোথাও আটক ব্যক্তিদের ক্যাম্পে রাখা হচ্ছে বলেও খবর মিলেছে। এমন প্রেক্ষাপটে মহারাষ্ট্র সরকারের এআই ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এনডিটিভির একটি অনুষ্ঠানে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফডনবীশ জানান, রাজ্যে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা চিহ্নিত করতে একটি এআই টুল তৈরি করা হচ্ছে। তার দাবি, আইআইটি মুম্বাইয়ের সহায়তায় তৈরি এই প্রযুক্তি বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ভুলভাবে কাজ করছে এবং চার মাসের মধ্যে তা শতভাগ নির্ভুলতায় পৌঁছাবে। তবে এই প্রযুক্তি ঠিক কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিষয়টি সামনে আসার পর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা নানা প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের ধারণা, এআই টুলকে প্রশিক্ষণ দিতে মানুষের চেহারা, ভাষা, পোশাক, আচার-আচরণ ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যের মতো নানা তথ্য ব্যবহার করা হতে পারে। এমনকি বাংলা ভাষায় কথা বলার ধরনও শেখানো হতে পারে যন্ত্রকে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় নির্ভুলভাবে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।
কলকাতাভিত্তিক ‘মিডিয়াস্কিলস ল্যাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও এআই বিশেষজ্ঞ জয়দীপ দাশগুপ্ত বলেন, এ ধরনের টুল মূলত বড় পরিসরের লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়। এতে ছবি, ভিডিও, অডিও, মানচিত্র ও নানা ডেটা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সমস্যা হলো— একই ধরনের ভাষা, পোশাক বা চেহারা ভারতের বহু অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই দেখা যায়। ফলে বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা ও ভারতীয় নাগরিকের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন করা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিস্ট অরিজিৎ মুখার্জী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এআইয়ের কার্যকারিতা পুরোপুরি নির্ভর করে তাকে কী ধরনের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে তার ওপর। সেখানে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ঢুকে পড়লে ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। তার মতে, লাখ লাখ ভাষার নমুনা বা আচরণগত ডেটা কে বাছাই করবে এবং কীভাবে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা হবে— সেটিই বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে নাগরিকত্ব ইস্যুতে দীর্ঘদিন কাজ করা অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের বিশেষ কর্মসূচি চালানো হয়েছে। সেখানে কতজন বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা শনাক্ত করা গেছে, তার পরিষ্কার হিসাব আগে দেওয়া উচিত। তার ভাষায়, নতুন করে এআই টুল আনার বিষয়টি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ বলেই মনে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী বহু অঞ্চলে একই ধরনের বাংলা ভাষা ও উপভাষা প্রচলিত। ফলে ভাষা বা উচ্চারণের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়। অতীতেও একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, ভারতীয় বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশি সন্দেহে আটক বা সীমান্ত পার করে পাঠানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মহারাষ্ট্রের এআই উদ্যোগ প্রযুক্তিগত সম্ভাবনার পাশাপাশি মানবাধিকার, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও ভুল শনাক্তকরণের আশঙ্কা সামনে এনে দিয়েছে। এই প্রযুক্তি বাস্তবে কতটা কার্যকর ও নিরপেক্ষ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।









