জাকাত কাদের জন্য? ইসলামের দৃষ্টিতে কে হকদার?

ধর্ম ডেষ্ক
ধর্ম ডেষ্ক
২৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ এ ৮:৪৭ এএম
জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, যা সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতার বন্ধন গড়ে তোলে। ছবিঃ সংগৃহীত

জাকাত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত, যা সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতার বন্ধন গড়ে তোলে। ছবিঃ সংগৃহীত

ইসলামের মৌলিক ইবাদতের মধ্যে ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ইবাদত হলো সালাতজাকাত। প্রতি মুসলমানের জন্য এটি একটি ফরজ ইবাদত, যা শুধু ব্যক্তিগত পবিত্রতা অর্জনের জন্য নয়, সমাজের দরিদ্র জনগণের জন্য একটি ন্যায়ের বন্ধন গড়ে তোলে। তবে, অনেকেই প্রশ্ন করেন—কাকে জাকাত দেওয়া যাবে এবং কাকে দেওয়া যাবে না? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সঠিকভাবে জাকাত প্রদান না করলে এটি আদায় হয় না। এ নিবন্ধে আমরা বিস্তারিতভাবে জানবো—কাদেরকে জাকাত দেয়া যাবে এবং কাদের দেয়া যাবে না, কুরআন, হাদিস ও ফিকহের আলোকে।

কুরআনে সালাত ও জাকাতের নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুরা আল-বাকারা, আয়াত ১১০-এ ইরশাদ করেছেন:

"তোমরা সালাত আদায় করো এবং জাকাত প্রদান করো। তোমরা নিজেদের জন্য যে উত্তম কাজ অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো, আল্লাহ তা দেখছেন।"

এছাড়া সুরা নূর, আয়াত ৫৬-এ তিনি আরো বলেন:

"তোমরা সালাত আদায় করো, জাকাত দাও এবং রাসুলের আনুগত্য করো—যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হতে পারো।"

এ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, সালাত ও জাকাত দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফরজ ইবাদত।

জাকাতের নির্ধারিত খাত

জাকাতের টাকা কাদের কাছে পৌঁছাতে হবে, তা কুরআনে উল্লেখিত আছে। আল্লাহ তাআলা সুরা তাওবা, আয়াত ৬০-এ ইরশাদ করেছেন:

"জাকাত তো কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত, জাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের মন জয় করতে হয়, দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান।"

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে

  • গরিব: যে ব্যক্তি খুব সামান্য সম্পদ নিয়ে জীবন ধারণ করছেন এবং একদিনের খাদ্যও তার কাছে নেই, তাকে জাকাত দেয়া যাবে।

  • ঋণগ্রস্ত: যেসব ব্যক্তির ঋণ পরিশোধ করার পর কোনো নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে না, তাদের জাকাত দেয়া যাবে।

  • সফরে অভাবগ্রস্ত: ধনী হলেও, যারা সফরে গিয়ে অভাবে পড়েছে বা মালমাল চুরি হয়ে গেছে, তাদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী জাকাত দেয়া যেতে পারে।

  • দ্বীনদার গরিব: দ্বীনদার গরিবদেরকে জাকাত দেয়া উত্তম। তবে, যদি কোন ব্যক্তি গুনাহে অর্থ ব্যয় করবে বলে মনে হয়, তবে তাকে জাকাত দেয়া উচিত নয়।

যাদের জাকাত দেওয়া যাবে না

  • ধনী ব্যক্তিরা: যারা সোনা, রূপা, টাকা-পয়সা বা বাণিজ্যদ্রব্যের মালিক এবং যাদের সম্পদ নিসাব পরিমাণ, তাদেরকে জাকাত দেয়া যাবে না।

  • অতিরিক্ত সম্পদের মালিকরা: যদি তাদের কাছে জাকাতযোগ্য সম্পদ না থাকে, তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অন্য সম্পদ যেমন আসবাবপত্র বা পোশাক রয়েছে, তাদেরও জাকাত দেয়া যাবে না।

  • জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয়: রাস্তা নির্মাণ, সেতু তৈরি, কূপ খনন বা বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থা—এই ধরনের কাজের জন্য জাকাত ব্যয় করা যাবে না, কারণ জাকাতের টাকা সরাসরি হকদারের কাছে পৌঁছাতে হবে।

যারা জানলে জাকাত আদায় হয় না

  • অমুসলিমদের জন্য: মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মানুষের জন্য জাকাত প্রদান করা যায় না।

  • পারিবারিক সদস্য: নিজের পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, বা ঊর্ধ্বতন বংশধরকে জাকাত দেয়া যাবে না। তবে কাজের ছেলে বা মেয়ে যদি উপযুক্ত হয়, তবে তাদেরকে জাকাত দেয়া যাবে।

জাকাত ইসলামের একটি মহান সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইবাদত, যা ধনীদের সম্পদকে পবিত্র করে এবং দরিদ্রদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। তবে সঠিক ব্যক্তিকে জাকাত দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্য কোথাও ব্যয় করলে জাকাত আদায় হয় না। সঠিকভাবে জাকাত আদায় করলে তা শুধুমাত্র ফরজ ইবাদত পূর্ণ করবে না, বরং সমাজে ন্যায় ও সহমর্মিতার বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে।