হাদি হত্যা মামলায় নতুন তথ্য, ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে মুখ খুললেন ফয়সালের স্ত্রী


ছবি সংগৃহীত
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জিজ্ঞাসাবাদে। মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদের স্ত্রী সামিয়া ডিবিকে জানিয়েছেন, দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি হিসেবেই ফয়সাল তাঁর নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ রেখে গিয়েছিলেন। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বুধবার (১৪ জানুয়ারি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
হাদি হত্যার পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন ফয়সাল করিম মাসুদ। হত্যার পর ভারতে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে প্রধান আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে ডিবি।
ফয়সালের নাম হত্যাকাণ্ডে উঠে আসার পর তার ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব তল্লাশিতে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অনুসন্ধানে ৫৩টি ব্যাংক হিসাবে মোট ১২৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পায় সংস্থাটি। আদালতের নির্দেশে এসব হিসাব অবরুদ্ধ করা হয় এবং একই সঙ্গে সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা ফ্রিজ করা হয়।
এই অর্থের একটি অংশ নিয়ে আলাদা করে অনুসন্ধান চালায় গণমাধ্যম। তথ্য অনুযায়ী, হাদিকে হত্যার ঠিক এক মাস আগে ফয়সাল তার স্ত্রী সামিয়ার নামে ৬৫ লাখ টাকার একটি সঞ্চয়পত্র কেনেন। ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০২৩ সাল থেকে ফয়সাল ব্যবসার নামে লেনদেন করলেও এমন অভিযোগে জড়ানোর বিষয়টি তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল।
তদন্তে দেখা যায়, গত বছরের ৩ নভেম্বর ফয়সালের ব্যক্তিগত ও তার প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা অ্যাপল সফট আইটির হিসাবে ৪২ লাখ টাকা জমা হয়, যা আসে মিডল্যান্ড ব্যাংকে থাকা তার আরেকটি হিসাব থেকে। ওই অর্থ পে-অর্ডারের মাধ্যমে পাঠানো হয়। একই দিন অ্যাপল সফট আইটির হিসাব থেকে ৬৫ লাখ টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র কেনা হয়।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান বলেন, “ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট তদন্তে অভিযুক্তের অ্যাকাউন্টে ঘটনার আগে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পায়। ‘ফলো দ্য ফ্লো অব মানি’ নীতিতে অনুসন্ধান চালিয়ে আমরা বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তরের তথ্য পেয়েছি, যা আদালতের আদেশে ফ্রিজ করা হয়েছে।”
ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সামিয়া জানান, ফয়সাল দেশ ছাড়বেন জেনেই পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে এই অর্থ তার নামে রেখে যান। এ বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, “এই হত্যাকাণ্ডে বিভিন্ন ব্যক্তি ভিন্ন ভিন্নভাবে জড়িত ছিলেন—কেউ আগে জেনেও গোপন করেছেন, কেউ পরে পালাতে সহায়তা করেছেন, কেউ অস্ত্র সরবরাহ ও লুকাতে ভূমিকা রেখেছেন। সবার ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।”
তদন্তকারীরা আরও জানিয়েছেন, ফয়সালের দুবাইয়ে সম্পদ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত জানতে সিআইডি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে।
পটভূমি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিন ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স-কালভার্ট রোডে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে রিকশায় থাকা হাদির মাথায় গুলি করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তিন দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করা হয়, যা হাদির মৃত্যুর পর হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
ওসমান বিন হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ফয়সাল করিম মাসুদসহ মোট ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ১২ জন গ্রেফতার এবং পাঁচজন এখনো পলাতক রয়েছেন। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থের উৎস ও বিদেশে সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান শেষ হলে মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।








