চীন–বাংলাদেশ সহযোগিতা নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার স্পষ্ট বার্তা


রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় চীন–বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ফোরামের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি: সংগৃহীত
যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় চীন–বাংলাদেশ অংশীদারিত্ব ফোরামের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে চীনের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, বিনিয়োগকারী, বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী, অবকাঠামো, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও আইন খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বৈঠকে সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েস্ট চায়না স্কুল অব মেডিসিনের পরিচালক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বায়োমেডিকেল বিজ্ঞানী সিন-ইউয়ান ফু অধ্যাপক ইউনূসের দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষাবিদদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানায়, ‘ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেকনোলজি’র পরিচালনা পর্ষদের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা অ্যান্ড্রু জিলং ওং এবং ওয়ালভ্যাক্স বায়োটেক (সিঙ্গাপুর)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউচিং ইয়াও বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অন্তত ২২টি দেশে টিকা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পিসিভি ও এইচপিভি টিকা উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। যুক্তরাজ্য ও ইন্দোনেশিয়ায় তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন সিঙ্গাপুর রোবোটিকস সোসাইটির সহসভাপতি জিনসং ওয়াং, ফোর্ডাল ল ফার্মের ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ইউয়ান ফেং, বেইজিং উতং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লি রান, চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিষয়ক সহসভাপতি গাও ঝিপেংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। তারা বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রশংসা করেন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে মতবিনিময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
বৈঠকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস মাইক্রোক্রেডিট আন্দোলনের সূত্র ধরে চীনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, চীনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে মানুষের জীবনে পরিবর্তন দেখেছেন, যা পরবর্তীতে চীন নিজস্ব কর্মসূচির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছে।
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে সামনে রেখে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও বাংলাদেশ ও চীনের চলমান প্রকল্প ও সহযোগিতা থেমে থাকা উচিত নয়। স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও ডিজিটাল খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভবিষ্যতেও এই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্যখাতকে অন্তর্বর্তী সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসক–রোগী সংযোগ, চিকিৎসা ইতিহাস সংরক্ষণ এবং সহজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থার লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক ব্যবসাভিত্তিক ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প গড়ে তুলে কম খরচে ওষুধ নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথাও জানান।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় পেটেন্টমুক্ত টিকার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানের কথা স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, মানুষের জীবন রক্ষার চেয়ে মুনাফাকে অগ্রাধিকার দেওয়া লজ্জাজনক। তিনি উত্তরাঞ্চলে একটি ‘হেলথ সিটি’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন, যেখানে আন্তর্জাতিক হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা কেন্দ্র ও টিকা উৎপাদন সুবিধা থাকবে।
বৈঠক শেষে ধারাবাহিক সহযোগিতা ও সমর্থনের জন্য চীনা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধান উপদেষ্টা।










