ফুটবল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকে বয়কটের যত ইতিহাস


ফুটবল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকে বয়কটের দীর্ঘ ইতিহাস। ছবি: সংগৃহীত
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বড় আসর বর্জনের ইতিহাস নতুন নয়। বিসিবি শেষ পর্যন্ত ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় বাংলাদেশকে ছাড়াই এই বৈশ্বিক আসর আয়োজনের পথে এগোচ্ছে আয়োজকরা। তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ার ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নীতিগত নানা কারণে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক বর্জনের ঘটনা বহুবার ঘটেছে। ফুটবল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক—এই দুই মেগা আসরেই রয়েছে এমন বহু নজির।
ফুটবল বিশ্বকাপে বয়কটের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপ থেকেই। আয়োজক হওয়ার দৌড়ে হেরে যাওয়ায় ইতালি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস ও স্পেন অংশ নেয়নি। দীর্ঘ নৌভ্রমণের ধকল এড়াতে অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডও বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়। এ ছাড়া ফিফার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডও খেলেনি। ঘরের মাঠে সেই বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয় উরুগুয়ে।
১৯৩৪ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ বর্জন করে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। চার বছর আগে ইউরোপীয় দলগুলো তাদের দেশে খেলতে না আসায়, পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে খেলতে যেতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। এরপর ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপেও আয়োজক নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে, পরপর দুই আসর ইউরোপে হওয়ায় তারা বিশ্বকাপ বর্জন করে।
১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ বর্জন করে ভারত ও তুরস্ক। খালি পায়ে খেলার অনুমতি না পাওয়ায় ভারত বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়, যা পরে তাদের ফুটবল ইতিহাসে বড় আক্ষেপ হয়ে থাকে। আর্থিক সংকটের কারণে তুরস্ক অংশ নেয়নি। ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আফ্রিকার দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব সংকটের প্রতিবাদে আফ্রিকার ১৫টি দেশ একযোগে বিশ্বকাপ বর্জন করে।
রাজনৈতিক কারণেও বিশ্বকাপ বর্জনের নজির রয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে মরক্কো ১৯৭০ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকে সরে দাঁড়ায়। ১৯৭৪ বিশ্বকাপে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে চিলির বিপক্ষে প্লে-অফ খেলতে অস্বীকৃতি জানালে ওয়াকওভার পেয়ে মূল পর্বে জায়গা করে নেয় চিলি।
অন্যদিকে, অলিম্পিক গেমসেও রয়েছে দীর্ঘ বয়কট ইতিহাস। ১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক নাৎসি জার্মানির বর্ণবাদী নীতির প্রতিবাদে বর্জন করে স্পেন। ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিক বর্জন করে সাতটি দেশ। হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদে নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড সরে দাঁড়ায়, আর সুয়েজ সংকটের জেরে অলিম্পিকে অংশ নেয়নি মিসর, ইরাক ও লেবানন। তাইওয়ানকে অন্তর্ভুক্ত করায় চীনও অলিম্পিক বর্জন করে।
১৯৭৬ সালের মনট্রিল অলিম্পিক বর্জন করে আফ্রিকার ২৮টি দেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে বিরোধের জেরে এই বয়কট হয়। এরপর আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৬৫টি দেশ বয়কট করে ১৯৮০ মস্কো অলিম্পিক। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ১৪টি দেশ বর্জন করে ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক।
সব মিলিয়ে ইতিহাস বলছে, বিশ্ব ক্রীড়ার বড় আসরগুলো কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, নীতি ও শক্তির প্রতিফলনও বটে। বিভিন্ন সময় নানা কারণে বর্জনের পথ বেছে নিয়েছে দেশগুলো, যা ক্রীড়া ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে গেছে।









