নির্বাচন ঘিরে বাড়ছে ব্যয়, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির আশঙ্কা


নির্বাচনি অর্থপ্রবাহে চাপে বাজার, বাড়তে পারে পণ্যের দাম। ছবি সংগৃহীত
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংস্কার ইস্যুতে গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতিতে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়েছে। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের বাড়তি ব্যয়ের ফলে বাজারে চাহিদা বাড়ছে। অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতায় নির্বাচনি মাসে দেশের মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। রোববার আপিল নিষ্পত্তির শেষ দিন এবং ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে। তবে এর আগেই দেশজুড়ে নির্বাচনি তৎপরতা বাড়তে শুরু করেছে।
নির্বাচন ঘিরে সরকারি ব্যয়ের পাশাপাশি প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। পোস্টার, ব্যানার, তোরণ নির্মাণ, জনসংযোগ, সভা-সমাবেশ এবং ডিজিটাল প্রচারণায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। পাশাপাশি প্রবাসীরাও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে অতিরিক্ত রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। ফলে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ বেড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, “নির্বাচনের সময় সরকার ও রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও বেশি খরচ করে। এতে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ে এবং সাময়িকভাবে অর্থনীতি চাঙা হয়।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অর্থের বড় অংশ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হওয়ায় পণ্যের চাহিদা বাড়ে, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।
তার মতে, নির্বাচনি ব্যয়ের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত টাকার প্রবাহ পৌঁছায়। এতে খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও একই সঙ্গে বাজারে চাপ বাড়ে। বিশেষ করে আসন্ন রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
নির্বাচন কমিশন এবার আচরণবিধি কঠোর করলেও বাস্তবে ব্যয় কমেনি। পোস্টার নিষিদ্ধ থাকলেও ব্যানার, ডিজিটাল প্রচার ও জনসংযোগে খরচ বাড়ছে। রাজনৈতিক দল ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করছেন। এতে একদিকে যেমন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত চাঙা হচ্ছে, তেমনি কালোটাকার ব্যবহারের আশঙ্কাও বাড়ছে।
চলতি অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের জন্য ২ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি। নির্বাচনি ব্যয়ের পাশাপাশি গণভোট আয়োজনের কারণে ব্যয় আরও বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে সরকারের নির্বাচনি খরচ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে জানুয়ারির প্রথম ১১ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানুয়ারির প্রথম ১২ দিনে বাজার থেকে ৭০ কোটি ডলার কিনেছে, যার বিপরীতে বাজারে ছাড়া হয়েছে ৮ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এর ফলে বাজারে নগদ অর্থের সরবরাহ আরও বেড়েছে।
নির্বাচন ঘিরে অর্থনৈতিক তৎপরতা সাময়িকভাবে গতি আনলেও অতিরিক্ত নগদ টাকার প্রবাহ ও অনুৎপাদনশীল ব্যয় মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনি মাস ও রমজানকে সামনে রেখে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা প্রয়োজন।










