ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত কতটা চমক দেখাতে পারে?


জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য উত্থান নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ দমন-পীড়নের পর রাজনৈতিক মাঠে ফিরে আসা জামায়াত এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য চমক দেখাতে পারে বলে মনে করছেন সমর্থক ও বিশ্লেষকদের একটি অংশ।
আলজাজিরার ঢাকা সংবাদদাতা মাসুম বিল্লাহর প্রতিবেদনে ফরিদপুরের এক ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাকের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জামায়াতের মাঠপর্যায়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনে এই প্রথম তিনি মনে করছেন, যে দলকে তিনি সমর্থন করেন—জামায়াতে ইসলামী—ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সুযোগে রয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণায় তিনি ভোটারদের মধ্যে ঐক্যের ইঙ্গিত পাচ্ছেন বলেও দাবি করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় এবারের নির্বাচন মূলত দুই শিবিরে বিভক্ত—একদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের জোট।
আলজাজিরা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের ডিসেম্বরের জরিপ উদ্ধৃত করে জানায়, সেখানে বিএনপির সমর্থন ছিল ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ। পাশাপাশি সাম্প্রতিক দেশীয় জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থন ৩৪.৭ শতাংশ হলেও জামায়াতের সমর্থন প্রায় সমান, ৩৩.৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান জামায়াতের শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে জামায়াতের অতীত পটভূমিও তুলে ধরা হয়েছে। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দলটি নিষিদ্ধ ছিল এবং যুদ্ধাপরাধের মামলায় শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বা কারাবন্দি করা হয়। আলজাজিরার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আন্দোলনে দমন-পীড়নের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে।
২০২৪ সালের পর জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়, শীর্ষ নেতারা মুক্তি পান এবং দলটি সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠিত হয়। জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের আলজাজিরাকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শাসনে মানুষ হতাশ হয়েছে এবং তারা বিকল্প শক্তি খুঁজছে।
তবে প্রতিবেদনে জামায়াতের উত্থান নিয়ে উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে। অনেকের আশঙ্কা, দলটি ক্ষমতায় গেলে শরিয়া আইন চালু হতে পারে বা নারীর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জামায়াত দাবি করেছে, তারা সংবিধানের অধীনেই দেশ পরিচালনা করবে এবং সংস্কার বাস্তবায়নই তাদের অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের লড়াই নয়; এটি সংস্কার বনাম পুরোনো ব্যবস্থার মধ্যকার প্রতিযোগিতা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান আলজাজিরাকে বলেন, জামায়াত ভালো ফল করতে পারে, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া এখনো অনিশ্চিত।
প্রতিবেদনের উপসংহারে বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল শুধু দেশের রাজনীতিই নয়, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ও আঞ্চলিক কূটনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ফেব্রুয়ারির এই ভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।








