মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতি সামলানোই বাজেটের বড় চ্যালেঞ্জ: সিপিডি

অর্থনীতি ডেস্ক
অর্থনীতি ডেস্ক
১১ মার্চ, ২০২৬ এ ৪:১৩ এএম
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বাজেটের আগে বিশ্লেষণ তুলে ধরছে সিপিডি । ছবি: সংগৃহীত

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বাজেটের আগে বিশ্লেষণ তুলে ধরছে সিপিডি । ছবি: সংগৃহীত

নতুন সরকারের প্রথম বাজেট প্রণয়নের আগে দেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগ সংকট এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ধীরগতি—এসব চাপের মধ্যেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তুত করা হচ্ছে। অর্থনীতির এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাস্তবমুখী ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

সিপিডির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ পুরো অর্থবছরের জন্য প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এই সময়ে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর আদায় প্রায় ৫৯ শতাংশ বাড়াতে হবে, যা বাস্তবে অর্জন করা কঠিন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ২০ দশমিক ৩ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সিপিডির মতে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং কিছু বড় প্রকল্পের ব্যয় সীমিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমেছে।

এদিকে বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৫৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো কমেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

বৈদেশিক খাতে মিশ্র পরিস্থিতির কথাও উল্লেখ করেছে সিপিডি। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রপ্তানি আয়ে প্রায় ৩ দশমিক ২ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে একই সময়ে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান বাড়ার কারণে বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর কমানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, সৌর প্যানেল, বায়ু টারবাইন ও ব্যাটারি স্টোরেজের মতো পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কমালে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। এ জন্য কাস্টমস ডিউটি সর্বোচ্চ ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর সুপারিশও করেছে সংস্থাটি। প্রস্তাব অনুযায়ী সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের ওপর স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ ১ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর প্রতি গ্রামে ৬ টাকা নির্দিষ্ট আবগারি শুল্ক আরোপের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

সিপিডির প্রতিবেদনে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো, সার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং খাল পুনঃখননের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শক্তিশালী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘ফার্মার কার্ড’ কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, কার্যকর রাজস্ব সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদারের মাধ্যমে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।